Home চাকরির জন্য তরুণদের কতটুকু প্রস্তুত করতে পারছে বিশ্ববিদ্যালয় byISMAIL -October 08, 2024 0 তারিক মনজুরপ্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৪, ০৩: ০৪সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়স ৩৫ বছর করার আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, মেধা ও যোগ্যতা প্রমাণের ক্ষেত্রে বয়স কোনো বাধা হতে পারে না। তবে, এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। প্রথমত, আমাদের নিয়োগ পরীক্ষাগুলো কি সত্যিই মেধা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ প্রদান করছে? এবং দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি তরুণদের চাকরির বাজারের জন্য উপযোগী করে তৈরি করতে পারছে?যাঁরা সবে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন, তাঁদের অনেকেই চাকরির আবেদনের বয়স বাড়াতে আগ্রহী নন। তাঁদের বক্তব্য, বয়স বাড়ানোর ফলে অধিক বয়সী প্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় এগিয়ে থাকেন, ফলে তরুণদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে, গত কয়েকটি বিসিএস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ২৩ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ২৭ বছরের বেশি বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৫ শতাংশের মতো, এবং ২৯ বছরের বেশি বয়সী প্রার্থীরা ১-২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সুতরাং, চাকরির বয়স বাড়ানো হলে ‘ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট’দের জন্য সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়ে যায়।চাকরির আবেদনের বয়স ৩৫ করার মানে এই নয় যে, ওই বয়সেই চাকরি শুরু করা হবে। আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই, প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা, সব মিলিয়ে অন্তত দেড়-দুই বছর সময় লেগে যায়। এরপর প্রার্থীদের গোপন তথ্য যাচাই ও প্রশিক্ষণের কাজও রয়েছে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত ৩৫ বছর বয়সী একজন তরুণকে ৩৭-৩৮ বছর বয়সে চাকরি শুরু করতে হতে পারে। এটি পর্যালোচনা কমিটিকে মনে রাখতে হবে।এছাড়া, গড় আয়ু বেড়েছে বলে চাকরির বয়স বাড়ানোর যুক্তি তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দেশে উচ্চ বেকারত্বের হার যেমন, তরুণদের চাকরির পরীক্ষায় নিয়োজিত রাখলে তা অর্থনীতি ও উৎপাদনের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। অনেক দেশেই সিভিল সার্ভিসে যোগদানের জন্য বয়সসীমা ৩৫ বা তার বেশি, তবে সেখানে আবেদন করার একটি সীমা রয়েছে, সাধারণত ৫-৭ বার। আমাদের মতো উচ্চ বেকারত্বের দেশে তরুণদের শুধুমাত্র চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির দিকে মনোযোগী রেখে বেকারত্ব কমানোর আশা করা যায় না।প্রশ্ন উঠছে, বছরের পর বছর ধরে বিসিএস বা সরকারি চাকরির জন্য তরুণদের এত আগ্রহ কেন? এর সহজ উত্তর হল— ক্ষমতা এবং বিত্ত অর্জনের একটি ‘শর্টকাট’ পথ হিসেবে সরকারি চাকরি বেশ জনপ্রিয়। এমনকি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি বা অন্যান্য পেশাগত ক্ষেত্র থেকে পাস করা প্রার্থীরাও বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।এ বিষয়ে পর্যালোচনা কমিটি পিএসসির নিয়োগ পরীক্ষাগুলোকে নিয়মিত করার সুপারিশ করতে পারে। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার সংস্কার হয়েছে, এবং এখন মেধার সুযোগ বেড়েছে। তবে, নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা যেতে পারে। সবকিছুর আগে প্রশ্নপদ্ধতির পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোর নিয়োগ পরীক্ষায় ভাষিক যোগাযোগ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, এবং দলগত কাজের দক্ষতা পরীক্ষা করা হয়, যা আমাদের পরীক্ষাগুলোর ক্ষেত্রে প্রায় অনুপস্থিত।অন্যদিকে, আমাদের দেশের নিয়োগ পরীক্ষাগুলো প্রায়ই মুখস্থনির্ভর। বহুনির্বাচনী প্রশ্নের মাধ্যমে কি প্রার্থীদের বহুমাত্রিকভাবে যাচাই করা সম্ভব? আমাদের প্রশ্নকর্তারা সাধারণত এটা বিবেচনা করেন না। যেখানে মুখস্থ বিদ্যা চাকরির বাজারের প্রধান যোগ্যতা, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গাইড পড়া শুরু করে ভর্তি হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওই ধরনের প্রশ্নে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের আলাদা করা সম্ভব কি? এইচএসসি পাস শিক্ষার্থীরাও এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ভালো ফল করতে পারেন।মোটকথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম এবং পড়াশোনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তরুণদের চাকরির বাজারের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলছে না। অনেক ক্ষেত্রেই পাঠক্রম পরিকল্পিত নয় এবং প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগও সীমিত। ক্যারিয়ার গঠনের জন্য দেশের এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে রয়েছে।এখন আমাদের ভাবতে হবে, উচ্চশিক্ষায় কি সব শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেওয়া উচিত? যদি দেওয়া হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের চাকরির উপযোগী করে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে, অথবা অন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ দেখাতে হবে। তরুণদের সরকারি চাকরির সীমিত পরিসরের মধ্যে বন্দী করে রাখা হলে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ মুক্ত হতে পারবে না। Facebook Twitter